
রক্তে ভেজা শার্ট: সমকাল ভাবনা ও যুদ্ধদিনের বয়ান
সাহিত্য সমাজের দর্পণ। এ দর্পণে ফুটে ওঠে নানা বর্ণের চিত্র, ঘটনা আর দূর্ঘটনা। যা সমাজের সাধারণ মানুষের চোখে নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে না। যতোটা একজন লেখকের দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে। লেখকের দৃষ্টি কোনো কিছুকে উপেক্ষা করতে পারেনা। পারেনা -তার কারন, অন্তর্দৃষ্টিতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না। অন্তরের ভিতর প্রবল ঢেউয়ের মতো আলোড়িত হতে থাকে।
একজন লেখকের রয়েছে নিজস্ব একটি জগৎ। যে জগৎ তাকে ঠেলে দেয় তাড়নার ভিতর, তাকে পোড়ায় অন্তর্জালার দহনে। এ অন্তরপোড়া মানুষটি আর কিছুতেই বসে থাকতে পারেন না। তখন তিনি কলম ধরতে বাধ্য হন। কথাশিল্পী জিয়াউল হকও এর ব্যতিক্রম নন।
জিয়াউল হক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যুদ্ধদিনের ঘটনাকে ধরতে চেয়েছেন তাঁর রক্তে ভেজা শার্ট উপন্যাসের ভিতর দিয়ে।
উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র কলি এবং আবির। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতর দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। তাদের সম্পর্কের সমান্তরালে উঠে এসেছে সমকালীন অনেক বিষয়। বর্তমানে স্মার্ট ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারে মানুষের ভিতর বিভ্রান্তি ছড়ানো যতোটা সহজ, তার পাশাপাশি ভূয়া আইডি খুলে মানুষকে ধোকা দেওয়া যেন নিত্ত- নৈমিত্তিক ব্যাপার।
ছোটো বেলায় কলির মা সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়। সেই থেকে কলি তার নানা- নানীর কাছে থেকেই বড় হয়েছে। ওর নানা- নানীই যেন সব।
জিয়াউল হক,”নিরাপদ সড়ক চাই” প্রসঙ্গটি টেনে তুলেছেন। প্রতি বছর সড়ক দূর্ঘটনায় অনেক মানুষের প্রাণ হানি ঘটে। এর পাশাপাশি অনেকে পঙ্গুত্ব জীবন লাভ করেন। ফলে ঐ পরিবারটি দুর্বিসহ জীবন যাপন করেন। সম্প্রতি ঢাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি সড়ক দূর্ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশকে নাড়া দিয়ছে। এতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে। যদিও জনসচেতনতার জন্য ২২ অক্টোবর নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা হয়।
রক্তে ভেজা শার্ট মূলত একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস। উপন্যাসটির গোড়াতেই রহস্য শুরু হয় ১৬ ই ডিসেম্বরকে ঘিরে। এ দিনটিতে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কলি তার নানুভায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হয় । কিন্তু কেনো! সে রহস্যের সমাধান চায় কলি। কিন্তু কলি একাকী এ রহস্যের জট খুলতে পারেনা। তাই তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধু আবিরের সাথে ঘটনাটা শেয়ার করে। আর এভাবেই আবিরের সাথে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়।
লেখক মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি সমসাময়িক ঘটনাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, চির সবুজ এই দেশ, নদী মার্তৃক এই দেশ, জন সংখ্যার এই দেশ। এ দেশের উত্তরাঞ্চল রাজশাহীতে রয়েছে রেশম শিল্পের কিছু কারখানা। যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এখানে জিয়াউল হক কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। দেশীয় রেশম সুতার অভাব, যার ফলে উন্নত মানের কাপড় তৈরী সম্ভব হচ্ছে না। আর বিদেশ থেকে রেশম সুতা আমদানী করে এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে কিছু ব্যাবসায়ী। এভাবেও ভালো মানের কাপড় সম্ভব না। লেখক নিজেই বলেছেন-
“এখন এলাকায় রেশম গাছও যেমন কমে গেছে, তেমনি সুতা উৎপাদন করার আধুনিক টেকনিকগুলোও আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি।এখন আমাদের চাহিদার মাত্র ২৫ ভাগ স্থানীয় সুতা থেকে পূরণ হয়। বাকি ৭৫ ভাগ সুতা উচ্চ মূল্যে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সুতা দিয়ে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রন করা যায় না। তাই দিনদিন রাজশাহীর সিল্ক তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে।”
পৃষ্ঠা- ৬১
আরেকটি সম্ভবনাময় খাত পর্যটন শিল্প। লেখক রক্তে ভেজা শার্ট উপন্যাসে সাজেকের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। পাহাড়ী এ অঞ্চলের আঁকাবাঁকা সড়কের গোপন ভাঁজে যেন রহস্য লুকিয়ে আছে। যেমন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কলির হৃদয়ে। এ অনুদঘাটিত রহস্যই কলিকে বারবার যন্ত্রণা দিচ্ছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্থান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় নানা জটিলতা। পূর্ব বাংলার প্রতি অবহেলা,বঞ্চনা, শোষণে এ অঞ্চলের জনগন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন। এ আন্দোলনে ঝরে পড়ে এ দেশেের মানুষের উষ্ণ রক্ত। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ‘৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং একটি অনিবার্য ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। এখানেই লুকিয়ে রয়েছে কলির অবহেলার গোপন রহস্য।
১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হলেও পাকিস্থানিরা জনগনের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন নি। উল্টো চরম নির্যাতন চালিয়েছে। ২৫ মার্চের রাতে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে এ দেশের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। জিয়উল হক একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় ঘটনার অনুপঙ্খু বিবরণ তুলে ধরতে পেরেছেন তার উপন্যাসে-
” ২৭ মার্চ সকাল থেকে পাকসেনাদের পাবনা টেলিফোন ভবন ক্যাম্পের উপর শুরু হয় সশস্ত্র পুলিশ ছাত্র ও সর্বস্তরের সাধারণ জনতার প্রবল প্রতিরােধ যুদ্ধ। আমরা দু’বন্ধু তখন আনোয়ারদের লাইসেন্স করা টুটুবোর রাইফেল নিয়ে টেলিফোন ভবনের সবচেয়ে কাছের বাণী সিনেমা হলের ছাদে অবস্থান নিয়ে শক্রুদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করলাম…”
পৃষ্ঠা-১৫৮
যুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ বাঙালি সীমানা পাড়ি দিয়ে ভারতে অবস্থান করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সশস্ত্র ট্রেনিং নেওয়ার জন্য ভারতে অবস্থান নেয়। এদের মধ্যে ছিলেন কলির নানাজি আর তার বন্ধু আনোয়ার। সমগ্র উপন্যাস জুড়েই আনোয়ার চরিত্রটি বিদ্যমান অথচ নীরব। এই রহস্যময় চরিত্রটির খোঁজ পাওয়া যায় উপন্যাসের একেবারে শেষের দিকে।
ভারত থেকে ট্রেনিং শেষে কবির এবং আনোয়ার দেশে ফিরে আসে। তারপর সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। বগুড়ায় পাকসেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে পাকসেনারা পিছু হটতে শুরু করে। ঠিক শেষ মূহুর্তে শক্রু পক্ষের একটি গুলি আনোয়রের বুক ভেদ তরে চলে যায়। তার গায়ে ছিলো একটি সাদা শার্ট। সে শার্ট মূহুর্তে রক্তে রাঙা হয়ে ওঠে। যুদ্ধে শহীদ হন আনোয়ার। তাঁর এই মৃত্যুর ভিতরেই রয়েছে কলির ১৬ ই ডিসেম্বরের কষ্টের রহস্য।
কথাশিল্পী জিয়াউল হক এ উপন্যাসে একটি কৌশলী ভুমিকা অবলম্বন করেছেন, তাহলো- উপন্যাসটি রোমান্টিক আবহে লিখিত হলেও সমগ্র উপন্যাস জুড়ে রয়েছ মুক্তি যুদ্ধের পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব। যা এ প্রজন্মের পাঠকে নাড়া দিয়ে যাবে।
শুধু এ প্রজন্মের পাঠককেই নয়, এ উপন্যাসটি সব শ্রেণির পাঠকের ভালো লাগার মতো একটি বই।
-জহুরুল ইসলাম



