বৃহস্পতিবার , ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সাঈফ ফাতেউর রহমান

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মুক্তির প্রগাঢ় আকাঙ্খা এবং শৃঙ্খল মোচনের চেতনা মানুষের জন্মজাত। মানবীয় মৌল চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য, স্বকীয়তা বজায় রেখে আত্মসম্মানে উন্নত মস্তক সুপ্রভায় জীবন অতিবাহনের আকাঙ্খা মানুষের মৌলিক। মানুষ পশু নয়, তাই এই মহিমান্বিত বোধের স্ফূরণেই মানবীয় সুস্থতার বিকাশ ও বর্ধন।দেশে দেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন ও পরাধীনতার হীন-গ্রাস থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য দুর্বার গণ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। কখনোবা সুসংগঠিত প্রতিরোধে দুর্বার প্রাণবন্যায় অসম লড়াইয়েও প্রবল পরাক্রমী আধিপত্যবাদী, আগ্রাসী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েও জীবনজয়ী চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনতা মুক্তির প্রার্থিত বন্দরে পৌঁছেছে। দূর অতীতে যেমন, তেমনই বিগত কয়েক শতাব্দীব্যাপী এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় জাগরণের প্রবল ঢেউয়ে পরাশক্তির পরাভব অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং তারই ফলশ্রুতিতে উপনিবেশবাদের নাগপাশ থেকে বিমুক্ত হয়ে নব নব স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যূদয় হতে থাকে, ধ্বস নামে ঔপনিবেশিক শাসন শোষনের দূর্গে। কোন কোন দেশে আবার জনবিরোধী অশুভ শক্তির দর্প চূর্ণ করে জনজাগরণের প্রবল প্রবাহে মহিমান্বিত জনতা-শক্তির অভ্যূদয় ঘটে।

বৃটিশ আধিপত্যের অমানবিক দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন শোষনের অবসানে দ্বিখন্ডিত ভারতবর্ষে জন্মলাভ করে পাকিস্তান ও ভারত। জন্মক্ষণ থেকেই পঙ্গু অবয়বের পাকিস্তানের স্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে সুদূর দূরত্বের দুই খন্ড পাকিস্তানের ভাষিক, আচরণিক, সাংস্কৃতিক ভিন্নতার বিষয়। সময়াবর্তে যা প্রকটতর হতে থাকে। পূঞ্জীভূত হতে থাকে জনতা-ক্ষোভ, জ্বলে উঠতে থাকে প্রতিবাদ-দ্রোহের আগুন। ১৯৫২ সালের মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রক্তের স্রোতে রাজপথ রাঙিয়ে পাকিস্তান-পতনের যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, ’৫৪ এর নির্বাচন, ’৫৬, ৫৮,’৬২, ‘৬৪’ ‘৬৬, ছয় দফা, এগারো দফা, উনসত্তরের মহান গণ আন্দোলনের রক্তাক্ত সিঁড়ি বেয়ে এক সাগর রক্তের স্রোতে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মোৎসর্গে অভ্যূদয় ঘটে লাল সবুজের পতাকার শ্রীময় শুদ্ধতার এক নব প্রত্যাশার জনতা-সুরভিত দেশের। পদ্মা-মেঘনা-যুমুনা-ধলেশ্বরী-তিতাস-সুরমা বিধৌত বদ্বীপ বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে অসামান্য প্রভাময় জনতাস্মিত শুদ্ধ স্বদেশের যাত্রারম্ভ হয় ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে পাতক-পাকিদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লেখালিখি হয়েছে। বৈশ্বিক পরিসরেও বিভিন্ন দেশে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থনে রচিত হয়েছে কালজয়ী গান, কবিতা, রচিত হয়েছে যুদ্ধদিন উপজীব্য কালজয়ী অনুসন্ধানী তথ্যমূলক গ্রন্থরজি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে উদ্দীপনাময় কবিতা, কথিকা, গান ইত্যাকার শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সম্প্রচার মুক্তিযোদ্ধা ও জনতাকে উজ্জীবিত রেখেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর মহান মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য কবিতা, গান, কথাসাহিত্য, গবেষণাগ্রন্থ রচিত হয়েছে অনেক। আব্দুল গাফফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আহমেদ, রিজিয়া রহমান, সেলিনা হোসেন, আফরোজা পারভীন, হাসানাত আব্দুল হাই, আনিসুল হক, মোহসীন হুসাইন, প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য উপন্যাস রচনা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, যুদ্ধকালীন বাস্তবতা, জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং এরই বিপরীতে পর-পদলেহী, পরানুগ্রহভোজী কিছু ক্লিন্ন অপজীবের ভূমিকাও তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখিত ঔপন্যাসিক-কথা সাহিত্যিকদের বাইরেও আরও অনেকেই রচনা করেছেন বাস্তবতা-অনুবর্তী যুদ্ধকালীন চালচিত্র । তবে রণাঙ্গনের সন্মুখযোদ্ধাদের মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য কথা সাহিত্য , উপন্যাস রচয়িতার সংখ্যা অপ্রতুল।

পরম সন্তোষ ও তৃপ্তির সাথে তাই এক বসাতেই পাঠ সমাপন করা গেলো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অগ্রগামী বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হক’ এর বাস্তবানুগ ঘটমানতার চিত্রায়ন ঋদ্ধ উপন্যাস “একাত্তরের পরি।“ মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এবং জনচেতনা, নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণ, অকুতোভয়ে দুর্মর লড়াই, দ্বিধাহীন আত্মোৎসর্গ, অচেনা জনদেরকেও মুহূর্তে আপন করে নেওয়া ইত্যাকার বিষয়াবলীর পাশাপাশি একশ্রেণীর মানুষের লোভাতুরতা, অর্থগৃধ্নুতা, রিরংসা, দ্বেষ, অমানবিক পাশব সত্তাকেও সুচারু নৈপুন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে উপন্যাসটিতে। যুদ্ধদিনের প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও মানবীয় সুচেতনা, বৈরিতার মধ্যেও চন্দ্রহাসের প্রদীপ্তি পরিস্ফূট করেছেন লেখক।

পদ্মাপারের গ্রাম বালিয়াডাংগিতে অনুষ্ঠিত লাঠিখেলা প্রতিযোগিতা দিয়ে উপন্যাসের শুরু। গ্রামের তরুণেরা যেমন প্রবল উৎসাহে প্রতিযোগিতায় অংশনেয়, তেমনই বিপুল সাড়া পড়ে সারা গ্রাম এবং আশেপাশের গ্রামেও। তরুণ লাঠিয়ালদের কারো কারো প্রতি নিভৃতে অনুরাগ জন্ম নেয় তরুণী সুকন্যাদের। গোহালবাড়ি চরের লাঠিয়া; আজিমের প্রতি অনুরাগ জন্মে গ্রামীন কন্যা মনোয়ারার। আজিমের সহ-লাটিয়াল আবুলের প্রতি আকৃষ্ট হয় সানোয়ারা।লাঠিখেলায় আজিমের ঋদ্ধ শৈলি দর্শনেই অভিভূত মনোয়ারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে সানোয়ারা আবেগাপ্লুত হয় আবুলের প্রতি। এক পর্যায়ে আজিম-মনোয়ারা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়।তবে আবুল-সানোয়ারার প্রণয় পরিণতি অর্জন করতে পারে না।

দৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হতে থাকে। নিস্তরঙ্গ গ্রামীন জীবনের অনাড়ম্বর শুদ্ধ জীবনেও অভিঘাত আসে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হলে। বঙ্গবন্ধুর ০৭ মার্চের ভাষণ উদ্দীপ্ত করে সমগ্র দেশের জনতাকে। পদ্মাপারের গ্রামগুলি আর সহজ সরল মানুষের নিস্তরঙ্গ জীবনেও প্রবল ঢেউ ওঠে।
ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে ঘটনা পরম্পরা অগ্রবর্তী হতে থাকে। স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খানের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়া, বঙ্গবন্ধুর মার্চ ০৭ এর ভাষণ, জনজাগরণের উদ্বেলতা, দুই বন্ধু আজিম-আবুলের আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তি ইত্যাকার বিষয়াবলী তুলে এনেছেন লেখক।

মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভ থাকেই আজিম আবুলের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা। শিশু কন্যা পরীকে স্ত্রীর কাছে রেখ আজিমের যুদ্ধে অং শগ্রহণের জন্য গৃহত্যাগ, প্রশিক্ষণ গ্রহণ, অসমসাহসিকতায় দেশের মুক্তি অর্জনের জন্য লড়ে যাওয়া ইত্যাকার ঘটনাপ্রবাহ উপন্যাসের গতিকে শিথিল হতে দেয়নি।

“একাত্তরের পরি” উপন্যাসের চরিত্রাবলী বাস্তবের সাথে সাযুস্যপূর্ণ। কোন কোন চরিত্র ঐতিহাসিক। বঙ্গবন্ধু উপন্যাসের কেন্দ্রে। আজিম-মনোয়ারা বাস্তব চরিত্র। সন্তান পরিও। যুদ্ধ চলাকালীন মহামারীতে পরীর মৃত্যু, দাফন বিহীন পরিকে একখন্ড কাপড়ে আবৃত করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া বন্যাপ্লাবিত স্বদেশ বাস্তবতার সাথে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ। আজিমের বন্ধু আবুলের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার আর্তি আমাদেরকেও স্পর্শ করে।

রণাঙ্গনের যোদ্ধারা, কারো কারো অসমসাহসিকতা, শৃংখলাবোধ, আত্মত্যাগের মহিমাও নিবিড় আন্তরিকতায় তুলে ধরেছেন লেখক। কাহিণীর গতিপ্রবাহে যেসব চরিত্র উঠে এসেছে, তারা সকলেই আমার আপনার অতিচেনা। নাম ভিন্নতর হলেও কাহিণী বিন্যাসে আপনি আমিও এক রকটি চরিত্র।

“একাত্তরের পরি” এর কাহিণীর গতি এবং প্রবাহে যেসব চরিত্র সৃজিত হয়েছে, মূলত তারা সকলেই বাস্তব চরিত্রই। কেবল নামগুলি হয়তো ভিন্নতর।

মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা জিয়াউল হক কোন কল্পাশ্রয়ে এই উপন্যাসের কাহিণী বিন্যাস করেননি। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সম্পৃক্তি, অপারেশনে অংশগ্রহণ, যুদ্ধকালে চেনা-অচেনা জনতার স্বতঃস্ফূর্ত নিঃস্বার্থ সহযোগিতা ও ত্যাগ প্রত্যক্ষ করেছেন। নিজেও তাই লেখক এই উপন্যাসের এক লড়াকু চরিত্র।

“একাত্তরের পরি” উপন্যাসে লেখক জিয়াউল হক আন্তরিক শ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। চরিত্র চিত্রায়নে বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠ ছিলেন তিনি। যুদ্ধের বাস্তবতা ও সামগ্রিক প্রেক্ষাপট উপস্থানে ইতিহাসনিষ্ঠ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বর্ণনাতেও তিনি সত্যাশ্রয়ী থেকেছেন।

কোন কিছুই আরোপিত বলে মনে হয়নি তার লেখায়। ভাষা ঝরঝরে হওয়ায় গ্রন্থটি সুখপাঠ্য হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা ঔপন্যাসিক জিয়াউল হক মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য আরও কয়েকটি গ্রন্থেরও রচয়িতা।
১/ শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-১;
২/ শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-২;
৩/ শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-৩
৪/শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-৪
৫/ শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-৫
৬/শত মুক্তিযোদ্ধার বিজয়গাথা-৬
এছাড়াও তিনি রচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য উপন্যাস ” রক্তে ভেজা সার্ট।
এর বাইরেও তার উল্লেখযোগ্য ভিন্নতর আঙ্গিকের প্রকাশনাঃ
১/ জোৎস্নাভরা রাতে-কাব্যগ্রন্থ;
২/ গিরিঝরণা বাংলাদেশ-ভ্রমণকাহিণী;
৩/ হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ইতিহাস-ইতিহাস-গবেষণা;
৪/ বাংলাদেশের পাহাড় শুমারি।

“একাত্তরের পরি” প্রকাশকের একটি মানসম্মত পরিবেশনা। প্রচ্ছদ শোভন। কাগজের মান উত্তম। মূল্য যোউক্তিক। কিছু মুদ্রণত্রুটি পরিহারে আরও যত্নশীলতা প্রত্যাশিত ছিলো।

আমরা মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য উপন্যাস ” একাত্তরের পরি”র সার্বিক সাফল্য ও পাঠকপ্রিয়তা কামনা করি।
“একাত্তরের পরি” পাঠে নিষ্ঠ পাঠকের একটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি হবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাটের সুযোগ। তবে লেখকের কৃতিত্ব এখানেই যে, তথ্য পরিবেশন করতে গিয়ে কাহিণী বিন্যাসকে শ্লথ বা কষ্ট-পাঠ করে তোলেননি তিনি।
অধ্যাবসায়ী এবং নিরলস শ্রমী একনিষ্ঠ একাগ্রতায় লিখে চলেছেন তিনিi।
মুক্তিযুদ্ধ উপজীব্য নবতর গবেষণা এবং উপন্যাস তার কাছ থেকে আমরা পেতে থাকবো, সঙ্গতভাবেই এই দৃঢ় প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।