বৃহস্পতিবার , ১১ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্বাধীনতাযুদ্ধে স্মরণীয় ৭২ ঘন্টা -বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল হক

১২ ডিসেম্বর ১৯৭১। সন্ধ্যে পৌনে আটটা। আকাশবাণীর খবরে বলা হলো ’অল্প সময়ের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনী বগুড়া শহরের উপর আক্রমণ শুরু করবে’। মনে মনে পুলক অনুভব করলাম। সত্যিইতো আমরা বগুড়া আক্রমণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছি। আকাশবাণী তাহলে যুদ্ধ সংক্রান্ত সঠিক তথ্যই পরিবেশন করছে। বগুড়া আক্রমণের জন্য ভারতীয় বাহিনীর পাশাপাশি আমাদের মুক্তিবাহিনীর একটা ব্যাটেলিয়নও ছুটে চলেছে। রংপুর-বগুড়া সড়ক পথে তখনও আমরা বগুড়া শহর থেকে ১৫ মাইল দূরে রয়েছি। এখন আমাদের মূল সড়কপথে না গিয়ে পূর্বের গ্রামের ভেতর দিয়ে গিয়ে রাত ১২টার মধ্যে বগুড়া শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থান নিতে হবে। গ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা গাড়ি ব্যবহার করতে পারছি না। সাথে নিজেদের গোলাবারুদ। তাছাড়া গত দুই দিনের পলাশবাড়ি ও গোবিন্দগঞ্জের যুদ্ধে সহযোদ্ধারা সবাই ক্লান্ত। তা সত্বেও সবাই এগিয়ে চলেছি বীরদর্পে। আস্তে আস্তে রাত গভীর হয়ে আসছে। সমস্ত পৃথিবী ঢলে পড়ছে ঘুমের কোলে। আমাদের যাত্রার নিরব সাক্ষী আকাশের তারাগুলো। বনের ঝিঁঝি পোকারা ঝিঁঝি করে রণসংগীত বাজাচ্ছে।
ক্লান্তিতে শরীর চলতে চাচ্ছে না। তবুও আমরা ভুলিনি নিজেদের দায়িত্বের কথা। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করছি যথাস্থানে পৌছাতে। এরই মধ্যে স্থানীয় একজন লোকের কাছে জানতে পারলাম অন্ধকার রাতে আমরা ভুল পথে চলে এসেছি। রাত বারটার মধ্যে কোনভাবেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌছানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর মতিলাল চক্রবর্তী বিশ্রামের নির্দেশ দিলেন। স্থানীয় একজন এমপির বাড়িতে রাতের মতো আশ্রয় নিলাম। গ্রামের জনগণ আমাদের আপন করে নিলেন। তারা যেন ভালোবাসা দিয়েই আমাদের সকল ক্লান্তি মুছে দিতে চাইলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবন দিয়ে হলেও ওদের ভালোবাসার মূল্য দেওয়ার চেষ্টা করবো। ওদের স্বপ্নের স্বাধীনতার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে কুন্ঠা করবো না। ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম হানাদার খানসেনাদের পরাজিত করে আমরা স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছি। উত্তেজনায় ঘুম ভেঙে গেল। মনে মনে ভাবলাম, খোদা আমাদের স্বপ্ন কি সফল হবে না?
১৩ ডিসেম্বও, ১৯৭১। কাকডাকা ভোরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। বাঙালি ছাত্র জনতা নিয়ে গঠিত ’তুফানি ব্যাটেলিয়ন’ এর ছেলেরা ছুটে চলেছে তুফানের বেগে। আমাদের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার হলেও তার পূর্বপুরুষরা ছিল বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার বাসিন্দা। এ যুদ্ধ তার কাছেও যেন মাতৃভূমি শত্রæমুক্ত করার যুদ্ধ। একে একে কয়েকটি গ্রাম পার হয়ে এসে পড়লাম বগুড়া শহরের উপকন্ঠে। সামনে একটা খাল। তারপর একটা ফাঁকা মাঠ। মাঠের পশ্চিম প্রান্তে আমাদের অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা সমস্ত যুদ্ধ এলাকা নরক করে তুলেছে। আমাদের অগ্রযাত্রা রুখবার জন্য তাদের ভারী অস্ত্র সমানে গর্জে চলেছে। সামনের নালা ও ফাঁকা মাঠের মধ্যে শত শত কামানের গোলা ফেলা হচ্ছে। এরই মধ্যে ভেসে এলো কমান্ডিং অফিসারের বজ্রকঠিন নির্দেশ, ’এক নম্বর প্লাটুন এ্যাডভান্স’। সামনে এগুনোর অর্থই হলো নালার মধ্যে শত্রæসেনাদের গোলার সাগরে হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশের সাথে সাথেই এক নম্বর প্লাটুরের একটি সেকশন এগিয়ে চললো সেই গোলার সাগরে সাঁতার কাটতে। এর পরই আমার সেকশন। আল্লাহর নামে পা বাড়ালাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম না। সামনেই রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে সহযোদ্ধা মোয়াজ্জেম। সেলের আঘাতে তার পাদুটো উঠে গেছে। মোয়াজ্জেম কাতর কন্ঠে বললো, ’জিয়া তুমি আমায় ফেলে যেয়ো না’। যুদ্ধের মাঠে বন্ধুর কথা শোনার কোন সুযোগ থাকে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাকে ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে গেল। আর আমরা সন্মুখে এগিয়ে চললাম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে।
বাব বার মনে পড়লো প্রশিক্ষণ শিবিরের দিনগুলোর কথা। সারা দিন প্রশিক্ষণ শেষে পাহাড়ের পাদদেশে আমরা গোল হয়ে বসতাম। আর মোয়াজ্জেম শিলিগুড়ির বনভূমি মুখর করে মিষ্টি কন্ঠে গাইতো, ’ডেকোনা আমারে তুমি কাঠে ডেকোনা’। আমরা সবাই তন্ময় হয়ে তার মিষ্টি কন্ঠের গান শুনতাম। সেই দুরন্ত মোয়াজ্জেমের সাথে ঝরনার জলে গোসল করা, পাহাড়ের ঢালে অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা পাহাড়ি মেয়েদের সাথে চোখের ইশারায় কথা বলা-একে একে সব কথাই মনে পড়লো। যুদ্ধ কি সেই প্রাণবন্ত যুবককে কেড়ে নেবে? আমার মাত্র পাঁচ গজের মধ্যে একটা গোলা এসে পড়লো। সম্বিত ফিরে পেলাম। মনে মনে হতাশ হয়ে পড়লাম। এই যে সেলের বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের অনুকূলে কি একটি গোলাও আসবে না? মনে হলো আমরা যেন যুগ যুগ ধরে চলেছি এমন বিপদসংকুল পথে। এ পথের কী শেষ নেই? বহু কষ্টের পর নারকেল বাগানে ঘেরা একটা বাড়ির আঙিনায় আশ্রয় নিলাম। সবেমাত্র একটু স্বস্তির ভাব গেগে উঠেছে। এমনি সময় আকাশ ভেঙে যেন হাজারটা বাজ পড়লো বাড়িটার উপর। মনে মনে ভাবলাম খোদা একি অসম যুদ্ধ। আমরা শত্রæর গোলার অসহায় শিকার। আমরা যেন মরতেই এসেছি, মারতে নয়।
কিন্তু না, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই যুদ্ধের পট পরিবর্তন হয়ে গেল। আধুনিক যুদ্ধের একমাত্র অবলম্বন আমাদের দক্ষ আর্টিলারি বাহিনী পাল্টা আঘাত শুরু করলো। ওহ্! সেকি প্রতুত্তর। কোন জায়গা থেকে একটা গোলা আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের আটিলারি বাহিনী স্তব্ধ করে দিচ্ছে শত্রæর একটির পর একটি কামানকে। বিকেল চারটা নাগাদ সমস্ত যুদ্ধ এলাকা শান্ত হয়ে এলো। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে দেখলাম জলপাই রঙের পোষাক সজ্জিত হাজার হাজার ভারতীয় সেনা এগিয়ে যাচ্ছে শহর অভিমুখে। সন্ধ্যার পর আমাদের তুফানি ব্যাটেলিয়নকে বগুড়া-শেরপুর সড়কে অবস্থান নিতে বলা হলো।
১৪ ডিসেম্বও,১৯৭১। ভোর হতেই শুরু হলো নতুন উদ্যোমে যুদ্ধ। আমাদের ব্যাটেলিয়নের দুটি কোম্পানীকে দক্ষিণ রণাঙ্গনে নিয়ে আসা হলো। শহরের দক্ষিণে পাকিস্তানি সেনারা তাদের যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম আনার জন্য একটা অস্থায়ী বিমান বন্দর তৈরি করেছিল। সেখানে তাদের শক্তিশালী দুর্গ। ভারতীয় কয়েকটি ব্যাটেলিয়ন দক্ষিণের বনভূমিতে অবস্থান নিল। সাথে আমাদের ব্যাটেলিয়নের ব্রাভো কোম্পানী। আমাদের কোম্পানী কমান্ডার পূর্ব রণাঙ্গনে রয়ে গেছেন। কোম্পানীর চার্জে আছেন ইপিআরের নামদার ওস্তাদ। স্থানীয় একজন লোক জানালো এয়ারপোর্টের দক্ষিণের পুরা গ্রামটা শত্রæসেনাদের বাঙ্কারে ভরা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা কোন ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তারা আমাদের গ্রামের ভেতরের খবর নিতে বললেন। নামদার ওস্তাদ আমার এক সহযোদ্ধা জয়নাল ও আমকে গ্রামের ভেতরের খবর আনার দায়িত্ব দিলেন। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। গ্রামে ঢোকা আর আত্মহত্যা করা প্রায় একই কথা। কিন্তু যখন ভাবলাম আমাদের জীবন দিয়েও যদি যৌথবাহিনীর জন্য সঠিক সংবাদ আনতে পারি, মন্দ কি। দেশের জন্য শহিদ হওয়া সেতো গর্বের ব্যাপার। এতো লোক থাকতে আমাদের দুজনকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এটাওতো কম গর্বের না।
তাই নির্ভিক চিত্তে এগিয়ে চললাম গ্রামের দিকে। আমাদের ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। প্রথম দিনের আক্রমণ শুরুর পরই শত্রæসেনারা তাদের অগ্রবর্তী বাঙ্কারগুলো গুটিয়ে নিয়েছিল। গ্রামটি তখন জনশুণ্য। অনেক খোঁজাখুজির পর একজন বৃদ্ধ লোককে পেলাম। তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানলাম। তিনি আমাদের এয়ারপোর্টের দক্ষিণের বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। শত্রæসেনাদের ঘাঁটির ২০০ গজের মধ্যে বাড়িটির অবস্থান। সবই দেখলাম। ওদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই মজবুত। পাকা বাঙ্কার আর বালির বস্তা দিয়ে তাদের অবস্থানকে আরও দুর্ভেদ্য করে তুলেছে। দ্রæত ফিরে এলাম। যথারীতি রিপোর্ট করলাম। স্থির হলো শীঘ্রই আক্রমণ পরিচালনা করতে হবে। আমাদের ব্রাভো কোম্পানি এয়ারপোর্টের দক্ষিণের প্রধান দরজা বরাবর উক্ত বাড়ির পশ্চিম পাশে অবস্থান নিল। আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতীয় আরও কয়েকটি কোম্পানী। সবেমাত্র অবস্থান নিয়েছি। শত্রæর মনোবল তখন শুন্যের কোঠায়। ফায়ার কন্ট্রোল করে প্রতিপক্ষকে নিজেদের শক্তি জানতে না দেওয়ার যে কৌশল যুদ্ধে অবলম্বন করা হয়, তা তাদের মানা সম্ভব ছিল না। তাই দোতলা পাকা বাঙ্কার থেকে ভারী মেসিনগানসহ নানা রকমের হাতিয়ার একসাথে গর্জে উঠলো। আমি লাইং পজিসনে মাটিতে উপুর হয়ে শুয়ে দুই পা ফাঁক করে অবস্থান নিয়েছিলাম। শত্রæদের প্রথম আক্রমণের কয়েকটা গুলি আমার দুই পায়ের ফাঁকের মধ্যে আঘাত করলো। এক ইঞ্চি এদিক ওদিক হলেই আমার পাদুটো উঠে যেতে পারতো। তখন মনে মনে ভাবলাম, রাখে আল্লাহ মারে কে। শত্রæর আক্রমণের মুখে আমরা পিছু হটে এলাম। এভাবে সারাদিন একবার সামনে এগিয়ে যাওয়া, একবার পিছু হটে আসা। এই দিনের সন্মুখ যুদ্ধে বেশ কয়েকজন ভারতীয় সেনা প্রাণ বিসর্জন দিলেও ভাগ্যক্রমে কোন মুক্তিযোদ্ধার প্রাণহানি ঘটেনি। এই দিনের যুদ্ধের আর একটা বড় বৈশিষ্ট হলো কোন পক্ষই ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেনি।
সন্ধ্যার দিকে আমাদের আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে গেল। আমাদের কামানের গোলার আঘাতে শত্রæদের পাকা বাঙ্কার ধ্বসে পড়তে শুরু করলো। হযতোবা তারা এয়ারপোর্টের ঘাঁটি ছেড়ে শহরের মূল ঘাঁটিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু মিত্র বাহিনী ততক্ষণে পুরো এয়ারপোর্ট এলাকা ঘিরে ফেলেছে। পিছে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। তাই তারা প্রথম দিনের মতো শুরু করলো এলোপাথারি কামানের গোলা বর্ষণ। মিত্রবাহিনী অযথা লোকক্ষয়ের ঝুঁকি নিলেন না। তারা সাময়িক ভাবে পিছু সরে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। মাঝরাত পর্যন্ত চললো অবিরাম কামানের গোলাবর্ষণ। তারপর একেবারে শান্ত হয়ে এলো পুরো যুদ্ধ এলাকা। কয়েক দিনের একটানা যুদ্ধে আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই রাতের মতো বিশ্রামের ব্যবস্থা হলো।
১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১। খুব ভোরে ছুটলাম ফ্রন্টলাইনে। মনে হলো শত্রæদের এয়ারপোর্টের ঘাঁটি ফাঁকা। গুলি করেও কোন উত্তর পেলাম না। বগুড়ার প্রথম ঘাঁটি আমাদের আয়ত্তে। তাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে এক প্লাটুন ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্লাটুন ঢুকে পড়লাম শত্রæশিবিরে। ভুলে গেলাম যুদ্ধের নিয়মনীতি। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি শুরু করলাম। আমরা যে ফাঁদে পা দিয়েছি, অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই তা টের পেলাম। পাকিস্তানি সেনারা মূল ঘাঁটি থেকে সামান্য পিছনে পূনরায় ডিফেন্স লাইন গড়ে তুলেছে। তারা একযোগে চারিদিক থেকে আক্রমণ শুরু করলো। একেবারে বোকা বনে গেলাম। আমরা মাত্র দুটি প্লাটুন। সাথে হালকা অস্ত্র। কিভাবে তাদের প্রতিরোধ করবো। ভারী কামানের সহযোগিতায় শত্রæরা দ্রæত এগিয়ে আসছে। আমাদের বিপদের খবর ওয়ারলেসের মাধ্যমে ভারতীয় ব্যাটেলিয়নকে জানানো হলো। মুহুর্তে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো ভারতীয় কয়েকটি কোম্পানী। শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। সারাদিন ব্যাপি চললো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে উভয়পক্ষেরই প্রাণহানি হলো। শত্রæসেনারা তাদের একটা ট্যাংক হারালো। সেই পোড়া ট্যাংকটি কালের সাক্ষী হিসাবে পড়ে রইলো বগুড়া বনানী সিনেমা হলের পাশে। বিকেলের দিকে শত্রæরা পিছু হটে শহরের মূল ঘাঁটির দিকে যাত্রা করলো। আমরা আর একবার চরম বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম। শত্রæসেনারা পিছু হটার পর দক্ষিণ রণাঙ্গন একবারে শান্ত হয়ে এলো। সারা রাত ধরে হয়তোরা তারা তাদের নয় মাসের অপকর্মের হিসাব কষে কাটালো।
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পূর্ব আকাশে রক্তিম সূর্য উদিত হলো। আগের দিন শত্রæসেনারা দক্ষিণ রণাঙ্গন ছেড়ে শহরে চলে গেছে। এদিন বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে লাখো শহিদের রক্তে রাঙানো ভোরের উদিত সেই সূর্য স্থান করে নিল আমাদের জাতীয় পতাকার মাঝখানে। বিশে^র মানচিত্রে একটা নতুন দেশের জন্ম হলো। স্বাধীন সার্বভোৗম বাংলাদেশ। এই খবর রণাঙ্গনে পৌছার পর আমরা সকল মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম। গগনবিদারী জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ¯েøাগান আর আকাশ লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণ করে সারা দিন ধরে আমরা সেই আনন্দ উপভোগ করলাম। বিকেল নাগাদ আমরা তুফানি ব্যাটেলিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সেনা কমান্ডের অধীনে রণাঙ্গন ছেড়ে বগুড়ায় শাহ সুলতান কলেজে গিয়ে ক্যাম্প স্থাপন করলাম। দেশ স্বাধীন হলেও আমরা ভারতীয় বাহিনীর অধীনে রয়ে গেলাম।
বাঙালি জাতির আছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস। পৃথিবীর কোন শক্তিই তাদের দাবায়ে রাখতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা যুদ্ধ করেছে মুঘলদের বিরুদ্ধে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করেছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আ¤্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্ত গিয়েছিল, হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তান হানাদার হাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত ও দুই লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা সেই স্বাধীনতা আবার অর্জন করলাম। অদম্য বাঙালি জাতিকে যে জোর করে দাবায়ে রাখা যায় না, ইতিহাসে তা আবার প্রমান হলো। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।